চাঁপাইনবাবগঞ্জ | বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১ info@mohanonda24.com +৮৮ ০১৬৮২ ৫৬ ১০ ২৮, +৮৮ ০১৬১১ ০২ ৯৯ ৩৩
বাজি ধরে বলা যায়, বর্তমান সময়ে আপনি ঢাকা কলেজ নিয়ে যতগুলো সংবাদ দেখেছেন তার বেশির ভাগই মারামারি আর সংঘর্ষের খবর।

ঢাকা কলেজের গৌরবোজ্জল ইতিহাস

হ.আ/রিপোর্টার | প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৩ ০১:৩৬

হ.আ/রিপোর্টার
প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৩ ০১:৩৬

সংগৃহিত ছবি

বাজি ধরে বলা যায়, বর্তমান সময়ে আপনি ঢাকা কলেজ নিয়ে যতগুলো সংবাদ দেখেছেন তার বেশির ভাগই মারামারি আর সংঘর্ষের খবর। ঢাকা কলেজের ছেলেরা, আশেপাশের কিছু কলেজ ও নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়ায়। কিন্তু ঢাকা কলেজ মানেই মারামারি আর সংঘর্ষ নয়। ঢাকা কলেজের রয়েছে ১৮২ বছরের গৌরবময়  ইতিহাস।

চলুন জেনে নিই সেই ইতিহাস...

১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা কলেজের প্রথম ক্যাম্পাস ছিল সদরঘাটের বুড়িগঙ্গার তীরে। ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরে, অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে  এখানে ঢাকার বাইরে থেকে ছাত্ররা প্রথম পড়তে আসে।  সেই সময়ে ১৫ জন ছাত্র বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে সাত জন ফরিদপুর, দু-জন  বরিশাল , দু-জন যশোর এবং দু-জন ময়মনসিংহ থেকে এসেছিলো। এছাড়া ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকেও   ভর্তি হয়েছিলেন দুই জন ছাত্র।

১৮৫৬ সালে গণিতশাস্ত্রের পণ্ডিত অধ্যাপক ব্রেনান্ডকে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ব্রেনান্ড নিয়োগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা কলেজের উন্নতির জন্য নানান ব্যবস্থা নেন।  তাই ব্রেনান্ডকে পেয়ে ঢাকা কলেজের মান বাড়তে থাকে। এর পর ১৮৫৭ সালে ২৪ জানুয়ারি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই, ঢাকা কলেজকে এর অধিভুক্ত করা হয়। সে সময় থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলোতে ঢাকা কলেজের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করতো। তবে ঢাকা কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা হোঁচট খায় ১৮৫৭ সালে  সিপাহি বিদ্রোহের সময়। এ বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তির। এই শহরের ইউরোপীয় কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবার, এমনকি ঢাকা কলেজের ইউরোপীয় শিক্ষকরাও এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সিপাহী বিপ্লবের কারনে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থনৈতিক ভিত্তি একেবারে ভেঙে পড়ে। ফলে সরকারের তরফ থেকে ঢাকা কলেজের শিক্ষাখাতে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ ছিল না।  তবে সময় তার নিজস্ব গতিতে গড়াতে থাকে। ১৮৫৯-৬০ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিল মোট ৫১ জন। এদের মধ্যে ২ জন খ্রীস্টান, ১ জন মুসলমান, এবং ৪৮ জন ছিল হিন্দু।

১৮৮০ সাল পর্যন্ত কোন ছাত্রাবাস ছিলনা। পরবর্তী সময়ে সরকারের অনুমতি নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুদানে ১৮৮০ সালে ঢাকা কলেজের জন্য বাংলাবাজারের শ্রীদাস লেনে ❝রাজচন্দ্র হিন্দু ছাত্র হোস্টেল❞ নামে প্রথম ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। এর আগে ১৮৫৭ সালে ঢাকা কলেজ বেশ বড় একটি মাইলফলক অর্জন করে। সে বছর ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান শাখা খোলা হয়। এটি ছিলো একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কেননা, এর মাধ্যমে পূর্ববাংলার তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানের ক্লাস শুরু হওয়ার পরে ঢাকা কলেজে ছাত্র ভর্তির হিড়িক পড়ে যায়। এভাবে ঢাকা কলেজ শিক্ষাক্ষেত্রে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছিল, যার সোনালী ফসল ছিলো ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি। ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পরপরই সেখানে লাইব্রেরী বসানো হয়েছিল। সময়ের বিবর্তনে এলে  লাইব্রেরীর বইয়ের সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। ১৯০৮ সালে ঢাকা কলেজের জন্য কার্জন হল নির্মান করা হয়। ওই বছরই ঢাকা কলেজ কার্জন হলে অভিবাসিত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা কলেজ তার সর্বস্ব নিয়ে ঠাঁই নেয় পুরাতন হাইকোর্টের লাট ভবনে যেটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট।

১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ তার আপন গৃহের  সন্ধান পায়। স্থায়ী ঠিকানা হয় মিরপুর রোড, ধানমন্ডি ঢাকা -১২০৫- এ। সে সময়ে ঢাকা কলেজের আয়তন ছিল ২৪ একর। তবে স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের সময় ঢাকা কলেজকে ছয় একর জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়। বর্তমানে ঢাকা কলেজের  মোট জমির পরিমাণ ১৮ একর। বিভিন্ন মুক্তির সংগ্রামে ঢাকা কলেজ প্রশাসন ও এর ছাত্ররা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়াই করেছে।  বিশেষ করে ৭১- এর স্বাধীনতা যুদ্ধে। ১৯৭২ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা কলেজের আট জন  ছাত্র শহীদ হয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া এই আট বীরকে শ্রদ্ধায় স্মরণে রাখতে মূল ভবনের প্রবেশদ্বারের বাম পাশের দেয়ালে পাথরখচিত স্মৃতিফলক রাখা আছে।

এমনই গৌরবময় অতীত আর ইতিহাসের আলোই ঢাকা কলেজ অনন্য। অতীতের মতো এখনো দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বে আছে  ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। বিখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সাইদ, মৌলভী ফরিদ আহমেদ এবং গল্পকার ঔপন্যাসিক শহিদুল জহির ঢাকা কলেজের শিক্ষকতা করেছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সরদার ফজলুল করিম, দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ঢাকা কলেজের সাবেক উপচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুত্র ও বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক শেখ কামাল,  ইতিহাস লেখক ও  কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ,  বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ন আহমেদ ছিলেন ঢাকা কলেজেরই ছাত্র । প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ঢাকা কলেজ যেন দ্বীপশিখা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: