চাঁপাইনবাবগঞ্জ | মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ info@mohanonda24.com +৮৮ ০১৬৮২ ৫৬ ১০ ২৮, +৮৮ ০১৬১১ ০২ ৯৯ ৩৩
উপজেলা এলজিইডি’র কার্যালয়ে মোবাইল ফোনে ডেকে সামনে সেলাই মেশিন রেখে ছবি তুলে তাদের বাড়িতে পরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে বাড়ি চলে যেতে বলেন।

ভোলাহাটে ছবি তুলেও সেলাই মেশিন পাননি ১১ নারী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২৪ ০৭:২৭

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২৪ ০৭:২৭

ভোলাহাটে ছবি তুলেও সেলাই মেশিন পাননি ১১ নারী (ছবি -সংগৃহীত)

সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে সরকারি সেলাই মেশিনের আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিয়েছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ২৭ জন নারী। তবে ১৬ জন নারীর ভাগ্যে সেলাই মেশিন জুটলেও ১১ জনের ভাগ্যে তা জোটেনি। উপজেলা এলজিইডি’র কার্যালয়ে মোবাইল ফোনে ডেকে সামনে সেলাই মেশিন রেখে ছবি তুলে তাদের বাড়িতে পরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে বাড়ি চলে যেতে বলেন। কিন্তু পরে আর সেলাই মেশিন দেওয়া হইনি। এ নিয়ে চরম হতাশ ওই নারীরা।

 

ভোলাহাট এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় নারী উন্নয়ন ফোরামের জন্য মোট প্রাপ্ত বরাদ্দের ৩ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়। যার পরিমাণ ছিলো ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সেই টাকায় ২৭টি হত দরিদ্র পরিবারের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যথাযথ নিয়ম মেনে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ঠিকাদার নির্বাচিত করা হয়।

 

ভোলাহাট উপজেলার অন্তত ১১ জন নারীকে সেলাই মেশিন দেওয়ার নামে উপজেলা পরিষদে ডেকে মেশিনগুলো সামনে রেখে স্বাক্ষর নিয়ে ছবি তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলী মো. আছহাবুর রহমান।

 

সম্প্রতি এমন ঘটনায় স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক ও চাঁপাইনবাগঞ্জ এলজিইডি’র কাছে উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোসা. শাহনাজ খাতুন।

 

সরেজমিনে একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি প্রকল্পের টাকায় সেলাই মেশিন দেওয়ার কথা বলে তাদের ডাকা হয় উপজেলাতে। তাদের সামনে সেলাই মেশিনগুলো রেখে ছবিও তোলেন উপজেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মো. আছহাবুর রহমান। তবে পরে ওই মেশিনগুলো তাদের দেওয়া হয়নি।

 

সেলাই মেশিন না পাওয়ায় বজরাটেক পিরানচক এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগী মিম আক্তার বলেন, আমরা গরিব মানুষ। গরু-ছাগল পালি। প্রতিদিন কামাই করবো। এমন কিছুই নেই। তাই সেলাই মেশিন চালানো শিখি। পরে জানতে পারি উপজেলা থেকে সরকারি সেলাই মেশিন দেওয়া হবে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিয়েছিলাম। তার কিছুদিন পর উপজেলা হিসাব সহকারী মো. মকলেছুর রহমান আমাকে ফোন দিয়ে ডাকে। ফোন পেয়ে উপজেলাতে যাই। এসময় আমার সামনে সেলাই মেশিন রেখে ছবি ও স্বাক্ষর নিয়ে বলে পরে আপনাদের সেলাই মেশিন দেওয়া হবে আজকে চলে যান। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেলোও, আর আমাদের ডাক পড়েনি। আমরা মেশিনও পাইনি।

 

আরেকজন আলীসাহাপুর বজরাটের এলাকার বাসিন্দা মো. শাজাহান আলীর মেয়ে চারমিস খাতুন বলেন, আগে থেকেই সেলাই মেশিনের কাজ জানতাম। কিন্তু টাকার অভাবে কিনতে পারিনি। অনেকের মাধ্যমে জানতে পারি উপজেলা এলজিইডি থেকে সরকারি ভাবে ফ্রিতে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। সেজন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছিলাম। গত দুই মাস আগে উপজেলায় ডেকে সেলাই মেশিন সামনে নিয়ে আমাদের ছবি তুলে কাগজে সই করে নিয়েছে। কিন্তু সেলাই মেশিন দেয়নি। বলেছে পরে ডেকে দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেয়নি।

 

অন্যদিকে উপজেলার বাহাদুরগঞ্জ গ্রামের মাসুদ রানার স্ত্রী মৌসুমী খাতুন জানান, উপজেলা এলজিইডি থেকে আমাদেরকে ডেকে সেলাই মেশিন দিয়েছে। আমার সঙ্গে আরও ১০-১৫ জন ছিল। তবে এই মেশিনটি একেবারে নিম্নমানের। কাজ করা যায় না। এমন অচল জিনিস না দিলেও পারতো।

 

উপজেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের হিসাব সহকারী মকলেছুর রহমান বলেন, যাদেরকে মোবাইল করে ডাকা হয়েছিল। তাদের সবাইকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। একেকটি সেলাই মেশিনের বাজেট ছিল প্রায় ৮ হাজার টাকা।

 

এই অনিয়মের বিষয়ে সরাসরি উপজেলা এলজিইডি’র প্রকৌশলী মো.আছহাবুর রহমান এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের আগে সেলাই মেশিনগুলো বিতরণ করা হয়েছে। আমরা কোনো মেশিন ফেরত নেইনি। পাল্টা অভিযোগ উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহনাজ খাতুনের দিকে তুলে এ প্রকৌশলী বলেন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এসব বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যারা সেলাই মেশিন পেয়েছে। তাদের শিখিয়ে দিয়ে এসব কথা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। 

 

উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোসা. শাহনাজ খাতুন বলেন, মহিলাদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ প্রকল্পের জন্য ২৭ জনের নাম তালিকাভুক্ত করে এলজিইডি’র কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তারা ১৬ জনের মাঝে মেশিনগুলো বিতরণ করেন। কিন্তু বাকি ১১ জনকে কয়েক দফায় ডেকে সই নিয়ে সেলাই মেশিন সামনে রেখে ছবি তুলে তা ফেরত নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের ঠিকাদার আব্দুল গণি ও উপজেলা এলজিইডি’র প্রকৌশলীর যোগসাজশে ফেরত নেওয়া সেলাই মেশিনগুলো বিক্রি করে দিয়েছে।

 

আবার ঠিকাদার আব্দুল গণি বলেন, আমার এক ব্যবসায়ীক সহযোগীর মাধ্যমে উপজেলা এলজিইডি’র কাছে সেলাই মেশিনগুলো দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। 

 

স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোজাহার আলী গণমাধ্যমকে বলেন, সেলাই মেশিন বিতরণের অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা হবে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: